মূল কনটেন্টে যান
আজঃ শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২৬ -এ ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ - ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৮

উত্তম খাদ্যাভ্যাস তৈরি না হওয়ায় অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার বাড়ছে

উত্তম খাদ্যাভ্যাস তৈরি না হওয়ায় অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার বাড়ছে

মাসফিকুল , রংপুর সদর , রংপুর প্রতিনিধিঃ

প্রকাশিতঃ ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১৩ দুপুর আপডেটঃ ১ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৫ রাত

সংক্ষেপে

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘রংপুর জেলার মানুষের খাদ্য বৈচিত্র্যতা এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য ফলিত পুষ্টি’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

  • উপজেলা: রংপুর সদর
  • জেলা: রংপুর
  • বিভাগ: রংপুর

অস্বাভাবিক জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশই হয়েছে হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার, মানসিক সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে। দেশে ৫২ শতাংশ পুরুষ ধূমপান করেন এবং প্রতি পাঁচজনের একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। ২০২১ সালের হিসাবে, দেশে এক কোটি ৩১ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং ওই বছর এ রোগে ৭৫ হাজার ৬১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘রংপুর জেলার মানুষের খাদ্য বৈচিত্র্যতা এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য ফলিত পুষ্টি’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান), রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ছাদেকুল ইসলাম মূল প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন।

প্রবন্ধে বলা হয়, রংপুরের মানুষের খাদ্য তালিকার ৬৭ শতাংশই দানাদার খাদ্য। একজন ব্যক্তির প্রতিদিন পাঁচ গ্রাম লবণ গ্রহণের কথা থাকলেও রংপুরে গড়ে তা ১১ গ্রাম। একইভাবে প্রতিদিন ২০ গ্রাম চিনি গ্রহণের কথা থাকলেও গ্রহণের পরিমাণ পাঁচ গ্রাম। শাকসবজি ও ফলমূল প্রতিদিন ৪০০ গ্রাম খাওয়ার সুপারিশ থাকলেও গড়ে খাওয়া হচ্ছে ৩১৭ গ্রাম।

এ ছাড়া রংপুরের শতভাগ মানুষ নিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার করছেন। উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে ৬০ শতাংশ মানুষের। ৯৬ শতাংশ মানুষের হাত ধোয়ার স্থানে পানি ও সাবানের ব্যবস্থা রয়েছে এবং ৫৯ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করে।

ড. ছাদেকুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং এতে স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলমূল কম খাওয়ার কারণেও বছরে প্রায় ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বাদাম, বীজ, শাকসবজি, সামুদ্রিক উৎস থেকে পাওয়া ওমেগা-৩ এবং আঁশজাতীয় খাবারের ঘাটতিও মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সেমিনারে জানানো হয়, বিশ্বে খাদ্যাভ্যাসজনিত এক কোটি ১০ লাখ মৃত্যুর মধ্যে প্রায় এক কোটি মৃত্যুই হৃদরোগের কারণে হয়ে থাকে। খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রতি পাঁচজনের একজনের আয়ু কমে যাচ্ছে বলেও সেমিনারে উল্লেখ করা হয়।

উত্তম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, দেশে রোগবিষয়ক গবেষণা কম হওয়ায় অসংক্রামক রোগের প্রকৃত চিত্র অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি হাসপাতালে রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১৫২টি আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষায় ৩৩ শতাংশ নমুনা অনিরাপদ পাওয়া গেছে।

বারটানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, নতুন প্রজন্মের পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এখন থেকেই সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আগের প্রজন্মের সময়ে পুষ্টি বিষয়ে প্রচারণা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে অনেক অভিভাবক পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানতেন না।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের সামনে অস্বাস্থ্যকর, প্রক্রিয়াজাত ও কৃত্রিম উপাদানযুক্ত খাবারের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। শিশু ও তরুণদের পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করতে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে বারটানের প্রধান কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, খাদ্যের পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে শুধু খাবার গ্রহণের দিকে নজর দিলেই হবে না। মাটি থেকে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রান্না এবং খাবার প্লেটে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্যের পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা কী খাচ্ছি, তার পাশাপাশি সেই খাবার থেকে শরীর পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে পুরো খাদ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমান বজায় রাখা জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর আর্থিক চাপও তৈরি হয়। সুস্থ থাকতে সবার স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান) আয়োজিত এ সেমিনারে কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ৫০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন। এতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, ভেজাল খাদ্য বাজারজাতের বিরুদ্ধে অভিযান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
 

মন্তব্য লিখুন

সাম্প্রতিক মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।