মূল কনটেন্টে যান
আজঃ বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ -এ ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ - ১৭ রবিউস সানি ১৪৪৮

রাষ্ট্র যখন মানুষের জীবনকে সহজ করে

রাষ্ট্র যখন মানুষের জীবনকে সহজ করে

রেহানা ফেরদৌসী , পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (কেন্দ্রীয় পুনাক)

আপডেটঃ 29 সেপ্টেম্বর, 2026

বিশ্বের জীবনমানের শীর্ষ ১০ দেশের গল্প
উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য অর্থনীতির আকারে নয়, নাগরিকের জীবনযাপনের মানে। একটি দেশ কতটা
উন্নত—এই প্রশ্নের উত্তর কি শুধু তার অর্থনীতির আকার, মাথাপিছু আয় কিংবা আকাশ ছোঁয়া
ভবনের সংখ্যায় পাওয়া যায়? সম্ভবত নয়। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি হয় মানুষের
দৈনন্দিন জীবনে—একজন নাগরিক কতটা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী কতটা
ভালো শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পান, অসুস্থ হলে কতটা কার্যকর স্বাস্থ্য সেবা পান এবং একজন
কর্মজীবী মানুষ কাজের পাশাপাশি কতটা স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন উপভোগ করতে পারেন। এই
জায়গা থেকেই জীবনযাত্রার মান একটি দেশের উন্নয়নকে দেখার গুরুত্বপূর্ণ একটি জানালা হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক জরিপে জীবনযাত্রার মানের বিচারে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায়
রয়েছে সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস,
অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও বেলজিয়াম। তালিকাটি মানুষের ধারণা ও মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি;
ফলে এটি কোনো দেশের সব বাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ পরিমাপ নয়। তবু দেশগুলোর অভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্য
আমাদের ভাবার যথেষ্ট কারণ দেয়।
সুইডেন ও ডেনমার্ক : নাগরিককল্যাণের ভিত
সুইডেনের শক্তি শুধু তার সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে নয়; সামাজিক সুরক্ষা, জনসেবা, পরিবেশসচেতনতা এবং
কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যেও।ডেনমার্কও নাগরিককল্যাণকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার
গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নাগরিকসেবার
সমন্বয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্থিতি তৈরি করেছে। এখানে উন্নয়নের ধারণাটি কেবল উৎপাদন
বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের জীবনকে স্বস্তিদায়ক করার সঙ্গেও তা যুক্ত।
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া : বৈচিত্র্যের মধ্যেও সম্ভাবনা
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে তাদের
বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, উচ্চশিক্ষার সুযোগ, পেশাগত সম্ভাবনা এবং বিস্তৃত প্রাকৃতিক পরিবেশের
কারণে। কানাডার বহুত্ববাদী সমাজ এবং অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থা ও
কর্মক্ষেত্র নতুন প্রজন্মের জন্য নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে। ফলে এই দেশগুলো
শুধু অভিবাসনের গন্তব্য নয়, অনেকের কাছে নতুন সম্ভাবনা নির্মাণের ক্ষেত্রও।

সুইজারল্যান্ড : শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার সমন্বয়
সুইজারল্যান্ডের পরিচয়ের সঙ্গে যেমন আল্পসের সৌন্দর্য জড়িয়ে আছে, তেমনি রয়েছে দক্ষ
প্রতিষ্ঠান, উন্নত অবকাঠামো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুসংগঠিত নাগরিকজীবন।একটি

দেশের নাগরিকজীবনে যখন নিয়ম, দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা একসঙ্গে কাজ করে, তখন
তার সুফল মানুষের প্রতিদিনের জীবনেও প্রতিফলিত হয়। সুইজারল্যান্ড তার একটি উল্লেখযোগ্য
উদাহরণ।
ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে : শিক্ষা, প্রকৃতি ও কল্যাণ
ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি তার শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার ফল
নয়, মানুষের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা দেশটির বিশেষ পরিচয়
তৈরি করেছে। এর সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশ ও সামাজিক আস্থাও যুক্ত হয়েছে। নরওয়ে আবার
দেখিয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণেও দীর্ঘমেয়াদি
বিনিয়োগ করা সম্ভব। প্রকৃতি, জনসেবা ও নাগরিককল্যাণের সমন্বয় দেশটির জীবনমানের একটি
গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
নেদারল্যান্ডস : পরিকল্পিত নগর জীবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত
নেদারল্যান্ডসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, উন্নত জীবনযাত্রা শুধু বড় বড় ভবন নির্মাণের ফল নয়;
শহরকে মানুষের উপযোগী করে তোলাও তার অংশ। পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা,
সাইকেলবান্ধব অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও কৃষিতে উদ্ভাবন—সব মিলিয়ে দেশটি আধুনিক জীবনযাত্রার
একটি স্বতন্ত্র মডেল তৈরি করেছে।
জার্মানি ও বেলজিয়াম : দক্ষতা, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক সংযোগ
জার্মানির শক্ত ভিত তৈরি হয়েছে শিল্প, প্রযুক্তি, গবেষণা, দক্ষতা ও অবকাঠামোর ওপর। শিক্ষা ও
গবেষণার সঙ্গে শিল্পের কার্যকর সংযোগ দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী
করেছে।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের বিশেষ গুরুত্ব তার ভৌগোলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থানে। ইউরোপের
কেন্দ্রস্থলে অবস্থান, বহুভাষিক পরিবেশ এবং ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি দেশটিকে
আন্তর্জাতিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তাহলে মানুষ কেন এসব দেশের দিকে তাকায়? কারণ মানুষের প্রত্যাশা সময়ের সঙ্গে বদলেছে।
একসময় উন্নত জীবন বলতে হয়তো বড় আয় বা উন্নত আবাসন বোঝানো হতো। এখন তার সঙ্গে
যুক্ত হয়েছে আরও কিছু মৌলিক প্রশ্ন— আমি কতটা নিরাপদ? আমার সন্তান কী ধরনের শিক্ষা
পাচ্ছে? অসুস্থ হলে কী ধরনের সেবা পাব? আমার শ্রমের মূল্য কতটা নিশ্চিত? কাজের বাইরে কি
আমার পরিবার ও নিজের জন্য সময় আছে? আগামীকাল নিয়ে কি আমার আস্থা আছে? এই
প্রশ্নগুলোর সম্মিলিত উত্তরই অনেকাংশে জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন
প্রান্তের মানুষ যখন উচ্চ শিক্ষা, গবেষণা, পেশা কিংবা নতুন জীবনের জন্য এসব দেশের দিকে
তাকান, তখন তাদের আকর্ষণের কারণ কেবল অর্থনৈতিক সুযোগ নয়। তারা এমন একটি পরিবেশ
খোঁজেন, যেখানে সুযোগের সঙ্গে নিরাপত্তা, উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতা এবং কর্মজীবনের সঙ্গে
ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য তৈরি করা যায়।
অবশ্য কোনো দেশই নিখুঁত নয়, কোনো আন্তর্জাতিক তালিকাও চূড়ান্ত সত্য নয়। একজন মানুষের
জন্য কোন দেশ উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করে তার শিক্ষা, পেশা, পরিবার, সংস্কৃতি, ভাষা ও
ব্যক্তিগত লক্ষ্যসহ নানা বিষয়ের ওপর। কিন্তু এই তালিকার দেশগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
দেয়— একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য শুধু সে কত সম্পদ তৈরি করেছে, তা দিয়ে নয়; সেই সম্পদ ও

ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তার নাগরিকের জীবন কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় হয়েছে—তা
দিয়েও বিচার করা যায়।
শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু একটি চাকরি কিংবা একটি বাড়ি খোঁজে না। মানুষ খোঁজে একটি সুন্দর
জীবনযাপনের পরিবেশ। আর সেই জায়গাতেই সুইডেন থেকে বেলজিয়াম—এই দশটি দেশের অভিজ্ঞতা
আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়: উন্নয়ন কি শুধু দেশের অর্থনীতিকে বড় করার
নাম, নাকি মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর করে তোলার নাম?
সম্ভবত দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তরেই লুকিয়ে আছে উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ।

মন্তব্য লিখুন

সাম্প্রতিক মন্তব্য

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পাদকের কলাম