ঘোড়াঘাটে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন
ঘোড়াঘাটে ২৪ ঘণ্টার অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎহীন অন্ধকার, অন্যদিকে মাস শেষে ‘ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল’! অসহনীয় গরমে নির্ঘুম রাত কাটানোর পর দ্বিগুণ বিলের কাগজ হাতে পেয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার পল্লী বিদ্যুতের হাজার হাজার গ্রাহক। ভূতের আসরের মতো বিলে তথ্যগত ভুল, গত বছরের পরিশোধিত বিল নতুন করে বকেয়া দেখানো এবং অযৌক্তিক বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে পুরো এলাকা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এবং গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে গুরুতর গাফিলতি ও ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে।
রানীগঞ্জ বাজারের বাসিন্দা নাসির উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, “পল্লী বিদ্যুতের মিটার রিডার বা বিল প্রস্তুতকারীরা সঠিকভাবে নামটাও লিখতে পারেন না। গ্রামের নাম ভুল, বাবার নাম ভুল। জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে বছরের পর বছর ধর্না দিয়েও এসব সংশোধন তো দূরের কথা, হয়রানি ছাড়া কিছুই মেলেনি সাধারণ গ্রাহকদের কপালে।”
আরও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান বলগাড়ী বাজারের সোহেল রানা। তিনি বলেন, “আমার শ্বশুর ২০১৯ সালে যে বিল পরিশোধ করেছেন, তার রসিদ এখনো আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। অথচ ২০২৬ সালে এসে সেই পরিশোধিত বিলকেই নতুন করে বকেয়া বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
একই সুর বলাহার এলাকার সাজ্জাদ হোসেনের কণ্ঠে। তিনি জানান, বিকাশে নিয়মিত বিল পরিশোধ করার পরও রসিদের বার্তা (মেসেজ) মেলে না এবং পরবর্তী মাসে তা বকেয়া হিসেবে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
এদিকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি দেখে চোখ ছানাবড়া সাধারণ গ্রাহকদের। ওসমানপুর কলেজপাড়ার আশরাফুল ইসলাম বলেন, প্রতি মাসে তাঁর বিল ১২০০-১৩০০ টাকার মধ্যে থাকলেও এ মাসে তাঁর বিল এসেছে ৩০০০ টাকা। একই অভিযোগ করেন কৃষ্ণরামপুর গ্রামের মাহফুজ। গত মাসে তাঁর বিল এসেছিল ৪০০ টাকা, এ মাসে এসেছে ৮০০ টাকা। অথচ বাসায় একটি ফ্রিজ ও একটি ফ্যান চলে।
ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ—সবার একই দশা। পৌরসভার আনভিল বাপ্পী, গ্রাহক শাহিনুর ইসলাম, সবুজ মিয়া ও শাকিলদের মতো শত শত গ্রাহকের বিল চলতি মাসে এক লাফেই দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
কৃষকরাও বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমন ধানের চাষসহ অন্যান্য কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিলের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গে যোগ হয়েছে লোডশেডিংয়ের ভেল্কিবাজি। এলাকা অনুযায়ী দিনে ও রাতে ১০-১২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা সীমাহীন কষ্ট ভোগ করছেন। সেই সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তোলপাড় চললেও শত শত গ্রাহক তাঁদের বিলের ছবি পোস্ট করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
ভোগান্তির বিষয়টি নিয়ে ঘোড়াঘাট জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ফেরদৌস আলম জানান, “জুন ও জুলাই মাসে গরম বেশি থাকায় বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। ফলে বিল কিছুটা বেশি আসতে পারে।” তবে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের মুখে দ্বিগুণ বিলের ‘ভূতুড়ে’ কাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাব-স্টেশনের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, “বড়পুকুরিয়া ফিডারের আওতাধীন এলাকায় কিছুটা সমস্যা রয়েছে, তবে পলাশবাড়ী ফিডারের দিকের অবস্থা তুলনামূলক ভালো।”
তবে রানীগঞ্জ সাব-জোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপকের (এজিএম) বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ অবস্থায় স্থানীয় ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, যেখানে দিনের অর্ধেকটা সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না, সেখানে বিদ্যুৎ বিল কীভাবে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বাড়ে? এটি একপ্রকার দাফতরিক চুরি ও দায়সারা আচরণ ছাড়া কিছুই নয়। অবিলম্বে এই ‘ভূতুড়ে বিল’ ও গ্রাহক হয়রানির নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং ভুল বিল সংশোধনের জোর দাবি জানিয়েছেন ঘোড়াঘাটবাসী।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন