সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি: বহিষ্কারের বদলে এবার অফিসার পদে স্থায়ী হচ্ছে সেই সোহান
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য অধ্যাপক শওকাত আলীর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা উপেক্ষা করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।সনদ জালিয়াতি করে চাকরি নেওয়া কর্মচারী সোহান মিয়াকে বহিষ্কার বা শাস্তির আওতায় আনার পরিবর্তে সিনিয়র অফিস সহকারী থেকে সেকশন অফিসার গ্রেড-২ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে এই পদে তার চাকরি স্থায়ী করার উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৬ আগস্ট চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য কনফার্মেশন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে সনদ জালিয়াতিতে জড়িত সোহানসহ বিতর্কিত ২৫ কর্মচারীর আপগ্রেডেশন স্থায়ী করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে। বোর্ডে উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও গণিত বিভাগের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম সদস্য হিসেবে থাকবেন বলে জানা গেছে।
এর আগে গত বছরের বিভিন্ন সময়ে ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ওই ২৫ কর্মচারীকে গণহারে পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে ইউজিসির ১৫ জুন ২০২৬ তারিখের এক চিঠিতে বলা হয়, প্রদত্ত আপগ্রেডেশনগুলো নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় চলতি বাজেটে এ খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। একই সঙ্গে এসব আপগ্রেডেশন বাতিল করে কর্মচারীদের দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং এ বিষয়ে কমিশনকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে ইউজিসির ওই নির্দেশনার পরও বেরোবি উপাচার্য ও তার প্রশাসন বিতর্কিত কর্মচারীদের আপগ্রেডেশন স্থায়ী করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, সনদ ও অভিজ্ঞতা জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ওই কর্মচারীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল জলিল মিয়াসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা চলমান রয়েছে। এ মামলায় তৎকালীন উপাচার্য আব্দুল জলিল গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদকের হাতে আসা নথিপত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সোহান মিয়া ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে অফিস সহকারী পদে যোগদান করেন। এই পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক পাস চাওয়া হলেও চাকরিতে যোগদানের সময় সোহান মিয়া উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছিলেন। তিনি চাকরিতে যোগদানের চার বছর পর ২০১৬ সালে স্নাতক (ডিগ্রি) পাস করেন এবং কর্মস্থলে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) সনদ জমা দেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য গোপন করে তিনি চাকরিতে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন চাকরি করে আসছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্নাতক পাস না করেও কীভাবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পেলেন, তা খতিয়ে দেখতে রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরও বিষয়টি কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি না করে ফাইল আটকে রেখে উল্টো সোহান মিয়াকে পদোন্নতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন। এবার তাঁর এই আপগ্রেডেশন স্থায়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী রোববার অনুষ্ঠেয় কনফার্মেশন বোর্ডের সভায় সোহান মিয়াসহ বিতর্কিত কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন,"সনদ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের শাস্তির আওতায় না এনে পদোন্নতি বা আপগ্রেডেশন দিলে অন্যরাও দুর্নীতি এবং অনিয়মের প্রতি উৎসাহিত হবে। যা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। "
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) কনফার্মেশন বোর্ডের সদস্য সচিব অধ্যাপক ফেরদৌস রহমান বলেন, যাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের আপগ্রেডেশন ও পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। তাদের কনফার্মেশনও হবে না।”
উল্লেখ্য যে, সোহান মিয়ার জালেয়াতির বিষয়ে দুদকের তদন্তও চলমান রয়েছে।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন