শেকড়ের টানে সবুজ প্রান্তর: ওঁড়াও নৃ-গোষ্ঠির জীবনের গল্প
মাটির বুকে লালিত এক অনন্ত কবিতার নাম ওঁড়াও (ওঁড়াও নৃগোষ্ঠী) জনপদ। যেখানে প্রান্তর জুড়ে সবুজের সমারোহ, আর দিগন্ত ছোঁয়া আকাশের নিচে জীবনের অন্যরকম এক গান বাজে। বরেন্দ্রভূমির রুক্ষতা আর স্নিগ্ধতার মিতালিতে, উত্তরবঙ্গ-এর বুক চিরে গড়ে উঠেছে এদের ঠিকানা। এ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক নিঝুম ক্যানভাস, যেখানে ঘাসফুল আর মাটির গন্ধ মিলেমিশে একাকার।
এদের পেশা মাটির গান গাওয়া। সোনাঝরা রোদে পিঠ রেখে এরা সোনা ফলায় ধরণীর বুক থেকে। কৃষি তাদের রক্তে, ঘামে আর নিঃশ্বাসে মিশে থাকা আদিম এক প্রেম। লাঙলের ফলায় জেগে ওঠে উর্বর মাটি, আর কৃষকের কড়া নাড়া দু'হাতে সোনালী ধানের শীষ মাথা নোয়ায়। ভোরের শিশির থেকে দুপুরের প্রখর রোদ—ওঁড়াও মানুষের জীবন মানেই মাটির সাথে মিতালি, ফসলের সাথে অবিচ্ছেদ্য এক মায়ার বন্ধন।
যখন কাজের ক্লান্তি মুছে আসে সাঁঝের আলোয়, কিংবা দুপুরের অলস অবসরে—তখন বাঁশের সবুজ কাঠি কথা বলে ওঠে তাদের জাদুকরী আঙুলে। দা আর কাঠির ছন্দে তৈরি হয় নিখুঁত শিল্প। বাঁশের বুক চিরে তারা গড়ে তোলে কুলা, ডালি আর নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় নানা সরঞ্জাম। এ শুধু পেশা নয়, এ হলো বাঁশের সাথে জীবনের অদ্ভুত এক সখ্য, যেখানে প্রতিটি টানে লুকিয়ে থাকে বেঁচে থাকার রূপকথা।
আর সংস্কৃতি? সে তো ঝরনার মতো বহমান। করম উৎসবের মাদল বাজলে পাহাড় বা সমতলের বুক কেঁপে ওঠে তাদের পদক্ষেপে। মাটির টানে গড়া সুরে, করম গাছের ডালে মাথা রেখে তারা খুঁজে নেয় আদিম শেকড়ের সন্ধান। ওড়াও জীবন মানেই মাটির সুবাস, বাঁশের বাঁশী আর সংস্কৃতির রঙিন ইন্দ্রজাল।
আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও ওঁড়াওরা ভোলেনি তাদের শেকড়। মাটির টান আর প্রকৃতির মমতা তাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা। ঐতিহ্য আর প্রগতির দীর্ঘ যাত্রায় ওঁড়াও নৃগোষ্ঠী আমাদের সংস্কৃতিরই এক অবিচ্ছেদ্য রত্ন।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন