রংপুর চিনি কলে ৬ বছর ধরে বন্ধ সাইরেনের ডাক, জং ধরা স্বপ্নে হারিয়ে যাওয়ার করুণ কাব্য
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে অবস্থিত ঐতিহ্যের রংপুর চিনিকল আজ প্রায় ছয় বছর ধরে নীরব নিস্তব্ধ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর থেকে এর চিমনি থেকে আর ধোঁয়া ওড়ে না, বাজে না শিহরণ জাগানো সাইরেন। শত শত কোটি টাকার ভারী যন্ত্রপাতি আজ মরিচা ধরে নষ্ট। আখচাষি ও শ্রমিকদের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে দীর্ঘশ্বাস, আর গ্রামীণ অর্থনীতি হারিয়ে ফেলছে তার পুরনো প্রাণচাঞ্চল্য।
১৯৫৭-৫৮ সালে মাড়াই মৌসুমে যাত্রা শুরু করা (রংপুর চিনিকল) মহিমাগঞ্জ তথা উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি ছিল। শীতের আমেজে যখন মিলের সাইরেন বেজে উঠত, তখন চারপাশের জনপদে উৎসবের আমেজ শুরু হতো। কৃষকরা গরুর গাড়িতে আখ বোঝাই করে হাসিমুখে কারখানার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মিল চত্বর মুখর থাকত হাজারো শ্রমিকের পদচারণায়। আজ সেই সুদিন কেবলই এক রূপকথা। কারখানার আঙিনায় এখন বুনো ঘাস আর ঝোপঝাড়ের রাজত্ব যেখানে হারিয়ে গেছে মানুষের হাসি আর কোলাহল।
আখ চাষিদের অবস্থাও করুণ। একসময় নগদ অর্থকরী ফসলের প্রধান ভরসা আখ চাষ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এক প্রবীণ চাষির আক্ষেপ— মিল ছিল বলেই মাঠে আখ ছিল, ঘরে টাকা ছিল, বাজারে প্রাণ ছিল। এখন কিছুই নেই।
মিলের বুকজুড়ে এখন শূন্যতা, আর মানুষের মনে জমে আছে না বলা বেদনা। কথা হয় মহিমাগঞ্জের প্রবীণ আখচাষি আব্দুর রহিমের সঙ্গে। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, "আখ ছিল আমাদের সোনার ফসল। মিল চললে হাতে টাকা আসত, সংসার চলত হাসিমুখে। আজ জমিগুলোর পানে তাকালে বুক ফেটে চোখে জল আসে। আখ চাষ বাদ দিয়ে এখন অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে।
মিলের বেকার হওয়া মেকানিক মোতালেব হোসেন ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "ওই সাইরেনটা ছিল আমাদের ঘড়ির কাঁটা, জীবনের ভরসা। ছয় বছর ধরে সাইরেন বাজে না, আমাদের ভাগ্যেও জং ধরে গেছে। ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সরকার বলে চালু হবে, কিন্তু চাকার জং তো খোলে না।"
এই বাস্তবতার মধ্যেই সম্প্রতি আশার কথা শুনিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, দেশের বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আর এই প্রক্রিয়ায় আখচাষি, শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক পরিচালনা— এই তিন বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তার ভাষায়, আমরা চাই, বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরুক, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুক এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি নিয়ে আসুক।
মন্ত্রী জানান, দেশের অধিকাংশ চিনিকলের বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছর পেরিয়েছে, তাই আধুনিকায়ন ও নতুন প্রযুক্তি ছাড়া কার্যকর পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, একটি কারখানা সচল থাকলে সরাসরি শ্রমিকের বাইরেও বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আরও অনেকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়, যা দারিদ্র্য হ্রাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়ভাবেও একই দাবি জোরালো। চিনিকলের ইনচার্জ মোহাম্মদ শাহিনুর ইসলাম বলেন, মাত্র ৭০-৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেই মিলটি পুরোদমে সচল করা সম্ভব। এতে প্রায় ১ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে, ২০ হাজার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি মিলবে।
গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন জানান, মিলটি দ্বিতীয় ধাপে চালুর সম্ভাবনা নিয়ে সরকারকে জানানো হয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, মিলটি চালু হলে তা এলাকার জন্য ইতিবাচক হবে।
বারবার পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে রাষ্ট্রে ও সমাজে, কিন্তু মহিমাগঞ্জের ভাগ্যাকাশের মেঘ কাটেনি। চালুর বহু আশ্বাস আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কেবল দেওয়ালের পোস্টার আর খবরের কাগজের পাতার কালিতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। মিল বাঁচলে মহিমাগঞ্জ বাঁচবে, উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি তার হারানো ছন্দ ফিরে পাবে—এই সরল সত্যটি যেন নীতিনির্ধারকদের টেবিলে গিয়ে থমকে যায়।
সাইরেন একবার ডাকলে ঘুম ভাঙত একটি শহরের। আজ সেই শহর নিজেই ঘুমিয়ে আছে এক অনন্ত আঁধারে, যেখানে জং ধরা স্বপ্নগুলো প্রতিদিন একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে মহিমাময়ী মহিমাগঞ্জের ধূলিমলিন বাতাসে।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন