সংগ্রাম থেকে সাফল্যের দিগন্তে
দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক জেলা গাইবান্ধা। কৃষিনির্ভর এই জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে আবদ্ধ। বন্যা, নদীভাঙন কিংবা দারিদ্র্যের অদৃশ্য শৃঙ্খল তাদের প্রতিনিয়ত আঘাত করে। তবু প্রতিকূলতার ভেতর থেকেও উঠে আসে নতুন নতুন সম্ভাবনা। বিশেষ করে নারীরা, যারা এতদিন গৃহস্থালির চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ সে নারীরাই হয়ে উঠছেন অর্থনৈতিক মুক্তির যোদ্ধা।
২০২০ সালের করোনা মহামারি এই পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে। মহামারির অভিঘাতে গাইবান্ধায় বহু পরিবার জীবিকার পথ হারায়। কেউ চাকরি হারান, কেউ ছোট ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হন। তখন সংসার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব এসে পড়ে নারীদের কাঁধে। এমন কঠিন সময়ে তাদের হাতে ছিল না কোনো মূলধন, ছিল না ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, এমনকি অনেকের ছিল না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তারা ঘরের ভেতরের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে পথ খুঁজে নেন। কেউ রান্না করে আচার বিক্রি করেন, কেউ পুরোনো সেলাই মেশিন চালু করেন, কেউ আবার উঠানে হাঁস-মুরগি লালন-পালন শুরু করেন। অতি সাধারণ এই পদক্ষেপগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ নেয় বৃহত্তর উদ্যোগে। প্রান্তিক নারীরা নতুনভাবে জীবন গড়ে তুলতে শুরু করেন।
এই পরিবর্তনের গল্পটি কেবল সংখ্যা বা পরিসংখ্যানের বিষয় নয় বরং মানুষের সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনি। সাদুল্লাপুরের মমতাজ বেগম হলেন গৃহিণী। স্বামীর চাকরি হারানোর পর সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তখন তিনি অল্প কিছু টাকা নিয়ে মুরগি লালন-পালনের কাজ শুরু করেন। শুরুটা ছিল নিছক বেঁচে থাকার প্রয়াস। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে তার খামার দাঁড়িয়ে যায় দৃঢ় ভিত্তিতে। এখন তিনি মাসে গড়ে আট থেকে দশ হাজার টাকা আয়ের পাশাপাশি সংসারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি করছেন। সংসারে তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সন্তানদের শিক্ষায় তিনি বড় অবদান রাখছেন। মমতাজ বেগম বলেন, 'সাহস থাকলে পথ খুঁজে পাওয়া যায়। আজ সংসারে আমি আর স্বামী সমান অংশীদার।'
একইভাবে ফুলছড়ির শাহিদা আক্তারের গল্পও অনুপ্রেরণার। মহামারির সময়ে বাড়িতে বসে পুরোনো সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই শুরু করেন। তার তৈরি পোশাক স্থানীয় বাজারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে তিনি অনলাইনে যুক্ত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি গড়ে তোলেন। এখন তিনি শুধু গাইবান্ধায় নয়, ঢাকা থেকেও নিয়মিত অর্ডার পাচ্ছেন। তার ভাষায়, আগে ভাবতেন গ্রামের মেয়েদের পক্ষে শহরের বাজারে জায়গা করে নেওয়া অসম্ভব, কিন্তু আজ তার নিজের উদাহরণই প্রমাণ করছে সম্ভাবনার বিস্তার কতটা। শাহিদা আক্তার বলেন, 'ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সুযোগ পেলে গ্রামের নারীরাও অনেক দূর এগোতে পারে।'
গোবিন্দগঞ্জের জেসমিন খাতুনের সাফল্যের গল্প আবারও দেখায় নারীর সৃজনশীলতা কীভাবে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। বাড়িতে বানানো আচার বিক্রি করেই তিনি শুরু করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় হওয়ার পর বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় তিনি প্রদর্শনীতে অংশ নেন। সেখান থেকে তার পণ্য ঢাকায় পৌঁছায়। এখন তার আচার বিভিন্ন সুপারশপে বিক্রি হচ্ছে। একসময় যে নারী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন, আজ তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। জেসমিন খাতুন বলেন, 'আগে ভাবতাম আমি কিছুই পারব না, এখন বুঝতে পারি নারীরাও পরিবারকে চালাতে পারে।'
এই নারীদের উদ্যোগ কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা গড়ে তুলছেন পারিবারিক অর্থনীতির নিরাপত্তা এবং স্থানীয় বাজারে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। বর্তমানে জেলাজুড়ে পাঁচ শতাধিক নারী উদ্যোক্তা সক্রিয় রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৫০ জন যুক্ত হয়েছেন জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি বাংলাদেশের (নাসিব) গাইবান্ধা জেলা শাখার সঙ্গে। এখানে তারা পাচ্ছেন দিকনির্দেশনা, নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ এবং সামান্য হলেও ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ। তবে নাসিব নেতাদের মতে, কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। সরকারি সহায়তা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ছাড়া এই নারীরা তাদের ব্যবসাকে চূড়ান্তভাবে এগিয়ে নিতে পারবেন না।
নাসিব গাইবান্ধা জেলা সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, 'করোনার সংকটে জন্য নেওয়া নারী উদ্যোক্তারা আজ সাফল্যের শিখরে। মহামারি পেরিয়ে নতুন স্বপ্ন নিয়ে দারিদ্রদ্র্য ও প্রান্তিকতা ভেঙে দাঁড়াচ্ছেন গাইবান্ধার নারী উদ্যোক্তারা। ছোট উদ্যোগ থেকে বড় সম্ভাবনা-এ যেন সামাজিক বাধা অতিক্রম করে গাইবান্ধার নারীদের সাফল্যের গল্প। প্রান্তিক জনপদের নারীরা ক্রমশ হয়ে উঠছেন টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি।'
গাইবান্ধার নারী উদ্যোক্তারা একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রথমত মূলধনের সংকট তাদের বড় বাধা। অনেক সময় তারা ঋণ নিতে গেলেও কঠিন শর্তে পড়তে হয়, যা পূরণ করা সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত প্রযুক্তি ব্যবহারের অদক্ষতা তাদের বাজার বিস্তারে সীমাবদ্ধ রাখছে। যদিও কিছু নারী অনলাইনে পণ্য বিক্রি শুরু করেছেন, তবু অনেকেই এখনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে জানেন না। তৃতীয়ত বাজারজাতকরণ
এবং ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে তাদের পণ্য স্থানীয় পরিসর পেরিয়ে যেতে পারে না। রফতানির সুযোগ থাকলেও জটিল কাগজপত্র ও পরিবহন খরচ তাদের পিছিয়ে রাখছে। তবে ইতিবাচক দিকও কম নয়। ইতিমধ্যেই গাইবান্ধার কিছু নারীর তৈরি পণ্য বিদেশেও পৌছেছে। যদিও এটি এখন সীমিত পরিসরে, তবু সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। যথাযথ সহায়তা পেলে এই নারীরা আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবেন।
গাইবান্ধার প্রান্তিক নারীরা আজ যে সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসছেন, তা নিছক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয় বরং সামাজিক রূপান্তরের অংশ। আগে যাদের কাজ কেবল রান্নাঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ তারাই পরিবারে সমান অংশীদার, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তারা প্রমাণ করে দিচ্ছেন, সুযোগ ও সহায়তা পেলে প্রান্তিক নারীরাও সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
এই নারীরা আসলে বাংলাদেশের অগণিত নারীর প্রতীক। মমতাজ, শাহিদা কিংবা জেসমিন কেবল তিনটি নাম নয় বরং হাজারো সংগ্রামী নারীর প্রতিচ্ছবি। তাদের গল্প মনে করে দেয়, প্রান্তিকতার দেয়াল ভেঙে উঠতে হলে সাহস ও অধ্যবসায়ই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সামাজিক স্বীকৃতি। গাইবান্ধার এই নারীরা এখনও পথের শুরুতে আছেন। তবে তাদের পদচারণে এক নতুন ইতিহাস রানা করছে। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি তাদের হাত শক্ত করে ধরে, তবে এই অদম্য নারীরাই হয়ে উঠবেন দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতের প্রাণশক্তি এবং নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নারীর জয়যাত্রা এখন আর কেবল সম্ভাবনা নয়; এটি ইতিমধ্যেই বাস্তব। গাইবান্ধার প্রান্তিক নারীরা প্রতিদিনই সেই বাস্তব রচনা করছেন।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন