মূল কনটেন্টে যান
আজঃ বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ -এ ২ আশ্বিন ১৪৩৩ - ৪ রবিউস সানি ১৪৪৮

রঙ হারাচ্ছে কুমারপাড়া : অস্তিত্ব সংকটে গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী মাটির শিল্প

রঙ হারাচ্ছে কুমারপাড়া : অস্তিত্ব সংকটে গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী মাটির শিল্প

আনোয়ার হোসেন

আনোয়ার হোসেন , গাইবান্ধা সদর , গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ

প্রকাশিতঃ ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৮ দুপুর আপডেটঃ ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৫৩ সকাল

সংক্ষেপে

গাইবান্ধায় প্লাস্টিক ও বিকল্প পণ্যের দাপটে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প সংকটে; কাঁচামাল ও জ্বালানির ব্যয় বাড়ায় পেশা বদলাচ্ছেন কারিগররা।

  • উপজেলা: গাইবান্ধা সদর
  • জেলা: গাইবান্ধা
  • বিভাগ: রংপুর

এক সময় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাদার গন্ধ আর চাকার ঘূর্ণনে মুখরিত থাকত যে পাড়াগুলো, সেখানে এখন নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা। আধুনিকতার ছোঁয়া আর প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও মেলামাইনের মেকি চাকচিক্যের দাপটে গাইবান্ধায় বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, সানকি, কলসি, গো-খাদ্যের চাড়ি আর পুতুল-খেলনার জায়গা দখল করে নিয়েছে সস্তা ও টেকসই প্লাস্টিক সামগ্রী। ফলে বাপ-দাদার শত বছরের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন স্থানীয় পাল সম্প্রদায়ের কারিগররা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর, সুন্দরগঞ্জ এবং সদরের বেশ কিছু এলাকায় মৃৎশিল্পীদের শত বছরের প্রাচীন বসতি রয়েছে। এক সময় বছরের এই সময়টাতে মাটির জিনিসপত্র তৈরির ধুম পড়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে কাঁচামাল তথা এঁটেল মাটির চড়া দাম, জ্বালানি কাঠের মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণের অভাব শিল্পটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পলাশবাড়ী উপজেলার পালপাড়ার প্রবীণ মৃৎশিল্পী কণিকা রানী পাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "মা-বাবার কাছ থেকে শেখা এই কাজ করে ২৬ বছর পার করলাম। আগে পুকুর বা খেতের মাটি ফ্রিতেই পাওয়া যেত, এখন টাকা দিয়ে কিনে আনতে হয়। তার ওপর খড়ি-কাঠের যে দাম, সেই তুলনায় মাটির জিনিসের দাম মেলে না। প্লাস্টিকের মেলামাইনের কারণে বাজারে এখন মাটির হাঁড়ি কেউ কিন্তে চায়না। পেটের দায়ে অনেকে রিকশা চালানো বা দিনমজুরের কাজ বেছে নিচ্ছে। সরকারি সহযোগীতা না পাইলে আমাদের পরের প্রজন্ম এই কাজ আর করবে না।"

স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "ছোটবেলায় দেখছি ফেরিওয়ালারা মাথায় করে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, খেলনা বিক্রি করতেন। আজ গ্রামের হাট-বাজারেও মাটির জিনিস খু্ঁজে পাওয়া যায় না। প্লাস্টিক আমাদের ঘরবাড়ি দখল করেছে ঠিকই, কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করছে। মৃৎশিল্প আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে বাঁচাতে হলে আধুনিক বিপনন ব্যবস্থা তৈরি করা এবং সরকারিভাবে মেলা বা প্রদর্শনীর আয়োজন করা জরুরি। 

গাইবান্ধা বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন)-এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক
আব্দুল্লাহ আল ফেরদৌস বলেন, "মৃৎশিল্প আমাদের আদি লোকশিল্পের অংশ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শৌখিন নকশাদার পণ্য তৈরিতে কারিগরদের অভ্যস্ত করতে আমরা কাজ করছি। মৃৎশিল্পীদের জন্য বিশেষ 'উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ' এবং সহজ শর্তে ঋনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। তাছাড়া যদি কারিগররা সমবায় ভিত্তির মাধ্যমে এগিয়ে আসেন, তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বাজারজাত করণে বিসিক সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।"

বাস্তবতা হলো, শুধু আশ্বাসের বাণী দিয়ে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বাঙালির হাজার বছরের এই ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে বাঁচাতে হলে এখনই সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। নতুবা খুব দ্রুতই হয়তো জাদুঘরের কাচঘেরা দেয়ালে ঠাঁই মিলবে গ্রামীণ জনপদের এই অনন্য শিল্পের।

মন্তব্য লিখুন

সাম্প্রতিক মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।