বৃক্ষমেলার নামে শালগাছ কাটা, নবাবগঞ্জে বন বিভাগের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
উপজেলা চত্বরে সদ্য রোপণ করা দুটি চারাগাছ বাঁচানোর অজুহাতে বন বিভাগের নিজস্ব হেফাজতে থাকা সরকারি শালগাছের কাঠ করাতকলে (সমিল) পাচারের এক উদ্বেগজনক উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে বন বিভাগের বিট অফিস থেকেই সংরক্ষিত শালগাছের গোলাই বাইরে পাঠানোর এই তোড়জোড় সামনে আসতেই চরম তোপাড় শুরু হয়েছে। রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া এবং ঘটনার সুরাহা করতে কর্মকর্তাদের একেক সময় একেক রকম মিথ্যাচারের আশ্রয় নেওয়া—সব মিলিয়ে বন বিভাগের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১ আগস্ট (শনিবার) দুপুরে। নবাবগঞ্জ বিট অফিসে সরেজমিনে দেখা যায়, অফিসে সংরক্ষিত সরকারি সাতটি শালগাছের মোটা গোলাই ভ্যানে চাপিয়ে করাতকলে নিয়ে যাওয়ার জোর প্রস্তুতি চলছে। কাঠের গন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বিট অফিসের কর্মচারী মো. এরশাদুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন জানান, বৃক্ষমেলার উদ্বোধনী দিনে উপজেলা পরিষদ চত্বরে রোপণ করা কাঞ্চন ও নিম চারাগাছের সুরক্ষাবেষ্টনী (খুঁটি) বানাতেই নাকি এসব শালকাঠ করাতকলে নেওয়া হচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। উপজেলা পরিষদ চত্বরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রোপিত চারাগাছ দুটি ইতোমধ্যে বাঁশের বেড়া দিয়ে যথাযথভাবে সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। নতুন করে কাঠ কেটে ঘেরা তৈরির কোনো বাস্তব চাহিদাই সেখানে নেই। বিষয়টি আরও পরিষ্কার করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, "চারাগাছের ঘেরা নির্মাণের জন্য বন বিভাগ বা অন্য কাউকে কোনো দায়িত্বই দেওয়া হয়নি।"
উপজেলা প্রশাসনের এই তথ্যের পর যোগাযোগ করা হলে নবাবগঞ্জ ফরেস্ট ডেপুটি রেঞ্জার মো. সুলতান মাহমুদ বিষয়টি ভিন্ন খাতে ঘোরানোর চেষ্টা করেন। মুঠোফোনে তিনি দাবি করেন, কাঠগুলো কেবল চারাগাছের বেড়া বানাতে নয়, বরং বিট অফিসের পাহারাদারের পুরোনো ভাঙা চৌকি মেরামত বা নতুন চৌকি তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য করাতকলে পাঠানো হচ্ছিল।
কিন্তু সংরক্ষিত শালগাছের সরকারি কাঠ এভাবে নিজের মতো ব্যবহার বা করাতকলে কাটাই করা বিধিসম্মত কি না—এমন সরাসরি প্রশ্নের মুখে এই কর্মকর্তা স্বীকার করতে বাধ্য হন, "না, এটি বিধিসম্মত নয়।"
এদিকে চরম অসঙ্গতি দেখা গেছে বিরামপুর চরকাই ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলামের বক্তব্যেও। তিনি সম্পূর্ণ দায় কর্মচারীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলেন, "উপজেলা চত্বরের চারাগাছ রক্ষায় কর্মচারীদের স্রেফ বাঁশের বেড়া দিতে বলা হয়েছিল; শালগাছের কাঠ কাটার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি।"
একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ের কর্মচারী, ডেপুটি রেঞ্জার এবং রেঞ্জ কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রমাণ করে—সরকারি বনজ সম্পদ আত্মসাতের এক সুসংগঠিত চেষ্টা চলছিল। 'চারাগাছের বেড়া' আর 'পাহারাদারের চৌকি'র অসংলগ্ন অজুহাত দিয়ে সরকারি শালকাঠ কেন এবং কার নির্দেশে করাতকলে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল, তা এখন তদন্তের দাবি রাখে। আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সরকারি সম্পদের এই নয়ছয়ের পেছনে কারা জড়িত, তা দ্রুত উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে বন আইন (Forest Act, 1927) অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন