আন্তর্জাতিক মা দিবস নিয়ে বেরোবি শিক্ষার্থীদের অনুভূতি
মা—একটি শব্দ, যার মধ্যে জড়িয়ে আছে ভালোবাসা, ত্যাগ, মমতা আর নিঃস্বার্থ আত্মদান। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে মায়ের ভূমিকা অনন্য ও অপরিসীম। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মা দিবস উপলক্ষে বিশ্বজুড়ে মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো হলেও, মায়ের অবদান কোনো একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এমনটাই মনে করেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)-এর শিক্ষার্থীরা। এবারের মা দিবসকে ঘিরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশার কিছু কথা তুলে ধরেছেন বেরোবি প্রতিনিধি মাসফিকুল হাসান
একজন সন্তানের জীবনে প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার উৎস হচ্ছেন মা। দূরে থেকে পড়াশোনা করা অনেক শিক্ষার্থীর জন্য মা দিবস হয়ে ওঠে আবেগঘন একটি দিন, যেখানে স্মৃতির ভাঁজে ভেসে ওঠে মায়ের স্নেহমাখা মুখ, যত্ন আর ভালোবাসা।
মাকে নিয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী হুমায়রা আনিসা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বুঝেছি, মা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আগে হয়তো ততটা উপলব্ধি করতে পারিনি। এখন দূরে থাকলে মায়ের ছোট ছোট যত্নগুলো খুব বেশি মনে পড়ে। চারদিক যখন অন্ধকার অমাবস্যায় আচ্ছন্ন, পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া মানুষগুলো যখন হঠাৎ বিলীন। স্বার্থপরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা যখন চরমে, তখন নিঃস্বার্থে একমাত্র ভরসার প্রতীক ও ঢাল হয়ে দাঁড়ায় যে সে মা। সব ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যে মানুষটি বটবৃক্ষের ন্যায় অবিচল ছায়ার মতো আগলে রাখে সেই ‘মা’ শব্দটির প্রকৃত অর্থে কোনো সংজ্ঞা হয় না, কোনো দিবস হয় না। পৃথিবীর সব মায়েরা ভালো থাকুক, মা ও সন্তানের বন্ধন সুদৃঢ় হোক, সব বৃদ্ধাশ্রম বিলীন হয়ে যাক।
পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সায়মাতুজ্জাহান মুন বলেন, মা সব সময় আমাদের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন। আমাদের সাফল্যের পেছনে মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাই মা দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ।যখন পুরো পৃথিবী আমার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, কেবল আপনি বিশ্বাস রেখেছিলেন। কেবল আপনিই মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন আমি পারব। রাতের পর রাত পাশে বসে সাহস জুগিয়েছেন। শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন, কেবল আমার সুন্দর জীবনের জন্য। আমার সব সফলতার অনুপ্রেরণা আমার মা। যে দিন প্রথম ক্যাম্পাসে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন, আমি ভেবেই নিলাম এই পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয় না।
ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নিয়ামতউল্লাহ ইমন বলেন, সমাজের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মায়েদের দায়িত্ব ও সংগ্রামও বেড়েছে। অনেক মা এখন পরিবারের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও সমানভাবে অবদান রাখছেন। তবুও সন্তানদের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও যত্নে কোনো ঘাটতি দেখা যায় না। শুধু মা দিবসে নয়, প্রতিদিনই মায়ের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশ করা উচিত। মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ, শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, যদিও মাকে ভালোবাসার জন্য বাধ্যতামূলক কোনো দিবসের প্রয়োজন নেই তবুও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মা দিবস সম্পর্কে বলতে চাই— পৃথিবীর সব মা যেন তার সন্তানের সঙ্গে সুখে-শান্তিতে থাকেন। কোনো মায়ের স্থান যেন আর বৃদ্ধাশ্রমে না হয়। মা দিবসে সব মায়েদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি।
জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী নাজনীন মুশফিকা বলেন, আমরা অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় পাই না। কিন্তু মা সব সময় আমাদের খোঁজ নেন। তাই অন্তত এই দিনে হলেও আমাদের উচিত মায়ের জন্য কিছু সময় বের করা। একজন সন্তানের কাছে সবেচেয়ে আপন মানুষ হলো তার মা। মা সম্পর্কটাকে শুধু দিবস দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। একজন সন্তানের কাছে তার মায়ের কোনো বিকল্প নেই। একজন মানুষ জন্মের পর থেকে তার জীবনের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের প্রতিটি পর্যায়ে তার মায়ের ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য। যে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে তার সন্তানের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে পারেন, তিনিই মা। সম্ভবত, একজন সন্তান মাকে হারানোর পরই তার জীবনে মায়ের প্রকৃত মূল্য ও অবদান সম্পর্কে অবগত হয়। আমার মা ছিলেন আমার জীবনে আশার আলো ও আশীর্বাদস্বরূপ। আমার জীবনে যতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, তার সব কৃতিত্ব উৎসর্গ করছি আমার মাকে। আজ হয়তো তুমি নেই তবে, তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। ভালো থাকুক পৃথিবীর মায়েরা।
ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী কানিজ ফারহানা মুভা বলেন, মা সন্তানের জন্য সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ উপহার। মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক সব থেকে গভীর, এ যে নাড়ির টান, চিরস্থায়ী বন্ধন। মা সন্তানের সব থেকে কাছের এবং সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, যাকে মন খুলে যা খুশি বলা যায়, নিছক অভিমান, কপট রাগ, একরাশ ভালোবাসা সবই তার কাছে। না, আমার আর রাগ অভিমান বা বিরক্তি প্রকাশ করার যেমন মা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, তেমনি মায়ের মমত্ববোধ, তার স্নেহ ভালোবাসা ছাড়া অস্তিত্ব¡ও নেই। মেয়েরা বরাবরই বাবা আদুরে হয়, আমিও ব্যতিক্রম নই। সেই কবে ছোট্ট বেলায় বলেছিলাম, আমি আব্বুকে তোমার থেকে একটু বেশি ভালোবাসি, কিন্তু আজ সময়ের সঙ্গে বুঝতে পারি আসলে এইটুকু কম বা বেশি কোনোটায় না, সমানভাবে ভালোবাসি।
বেরোবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় মা শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি অনুভূতি—যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, বিশ্বাস এবং নিঃশর্ত ভালোবাসা।
আন্তর্জাতিক মা দিবসে শিক্ষার্থীদের এই আবেগ, উপলব্ধি ও প্রত্যাশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধাবোধের।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন