এবার বেরোবিতে যেন ‘আয়নাবাজি’ ! নিয়োগপ্রার্থীই যাচাইকারী
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)-এ চতুর্থ গ্রেডের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, যাঁরা নিজেরাই নিয়োগের আবেদনকারী, তাঁরাই আবার আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, নিজেদের আবেদনপত্র নিজেরাই যাচাই করে বৈধ হিসেবে সুপারিশও করেছেন। ঘটনাটি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (প্রশাসন শাখা), অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং অতিরিক্ত পরিচালক (সেন্ট্রাল লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টার)—এই তিনটি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য আগামী ৯ মে নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. ফেরদৌস রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার মো. ময়নুল আজাদ (কাউন্সিল শাখা) এবং উপ-রেজিস্ট্রার তারিকুল ইসলাম (সংস্থাপন শাখা)।
তবে অভিযোগ উঠেছে, কমিটির সদস্য ময়নুল আজাদ ও তারিকুল ইসলাম নিজেরাই অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) পদে আবেদন করেছেন। পরবর্তীতে তাঁরা নিজেদের আবেদনপত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে সেগুলোকে বৈধ হিসেবে সুপারিশ করেন। বিষয়টিকে ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অসংগতি ও স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার আমিনুর রহমান। গত ২১ এপ্রিল তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণির (গ্রেড-৯) পদে ন্যূনতম ১৩ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৩তম সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত শর্ত অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে ১২ বছরের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। ফলে বিজ্ঞপ্তিতে অভিজ্ঞতার শর্ত এক বছর বাড়িয়ে দেওয়ায় অনেক যোগ্য প্রার্থী আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ এবং চাকরির শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৯-এর ধারা ২৩(২)(ফ)-এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার আমিনুর রহমান বলেন, “উপাচার্য দ্রুত একাধিক পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও আগামী ৯ মে নিয়োগ বোর্ডের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযোগ আমলে না নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হলে আইনের আশ্রয় নেওয়া হবে।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী। তিনি বলেন, “যাচাই-বাছাই কমিটিতে আবেদনকারী কোনো প্রার্থী থাকলেও সমস্যা নেই। তাঁর আবেদনপত্র যাচাইয়ের সময় তিনি উপস্থিত থাকেন না। আর ১২ বছরের পরিবর্তে ১৩ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়ার ক্ষেত্রে ইউজিসির অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। নির্ধারিত সময়েই নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হবে।”
নিয়োগপ্রক্রিয়াকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসন কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং নির্ধারিত সময়েই নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয় কি না।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন