বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন সুন্দরগঞ্জের প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা
গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা পশ্চিম রামধন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের ১৪ জন শিক্ষক ও ১৪ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ বেতন-ভাতা না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সরেজমিনে বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, উপস্থিতি, অবকাঠামো, জনবল, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি—সবকিছু সরকারি বিধি মোতাবেক থাকলেও দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ জাতীয়করণ কিংবা এমপিওভুক্তির আশায় নিয়মিত স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে আসছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা।
বিদ্যালয়টিতে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, বাক্প্রতিবন্ধীসহ মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ১৪৯ জন। চাহিদার তুলনায় হুইলচেয়ার মাত্র ২টি। অনেক শিক্ষার্থী হুইলচেয়ারের অভাবে শুধু বাবা-মা নয়, শিক্ষকদের কোলে বসে ক্লাস করছেন। এটি শুধু বিদ্যালয় নয়, যেন একটি ডে-কেয়ার সেন্টার। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং প্রতিদিন টিফিনের ব্যবস্থা করা এখন অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে গেছে।
প্রধান শিক্ষক এম. এ. আউয়াল কবির জানান, ‘আমি এবং আমার সহকর্মীবৃন্দ দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ সমাজের পিছিয়ে পড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। অন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে এটি আলাদা। এখানে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি শারীরিক যত্ন নিতে হয়। হাত ধরে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যাওয়া, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পথ দেখানো, শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের কৌশল অবলম্বন করে ইশারায় পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সবকিছু মেনে নিয়ে আমি এবং আমার সহকর্মীরা শিক্ষকতার পাশাপাশি মানবসেবা করে যাচ্ছি। ১০ বছর অতিবাহিত হলেও সরকারের সব শর্ত পূরণ করার পরও আমাদের কেন সরকার এমপিওভুক্ত করছেন না, তা আমার বোধগম্য নয়। আমরা বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছি।’ তিনি সরকারকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়গুলোকে দ্রুত এমপিওভুক্তির দাবি জানান।
সহকারী শিক্ষক এ. আর. রহমান শিপন জানান, ‘একদিকে বেতন নেই, সংসারে অভাব-অনটন। জানি না, আরও কতদিন স্বেচ্ছাশ্রম দিতে হবে। এখানে ক্লাস নিতে নিতে শিক্ষার্থীদের মায়ায় পড়ে গেছি।’ তিনি আরও জানান, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে এমন কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের হুইলচেয়ার দরকার। তারা না বসতে পারে, না দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে পারে। উপজেলা সমাজসেবা অফিস কিংবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা আশ্বাস দিলেও আমরা কোনো সহায়তা পাইনি। এরা সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ। এদের পাশে থাকা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।’
অপর শিক্ষক সুমি আক্তার জানান, তিনি ১০ বছর যাবৎ এখানে শিক্ষকতা করছেন। ‘সরকারি জাতীয়করণ তো দূরের কথা, আমরা এমন মানবিক কাজ করেও সরকারি কোনো সহায়তা পাই না। আমাদের দাবি, সারা দেশের সব বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হোক।’
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এসব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন