বিজিবি ও সাংবাদিকদের লাঞ্ছনা : পাথর খেকোদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে তিস্তার চরাঞ্চল
নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা নদী এখন এক বীভৎস মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। আইনের তোয়াক্কা না করে স্থানীয় একদল প্রভাবশালী 'পাথরখেকো' সিন্ডিকেট নদীর বুক চিরে যে তণ্ডবলীলা চালাচ্ছে, তাকে স্রেফ ‘লুটতরাজ’ বললে ভুল হবে—এ যেন এক সুপরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘পরিবেশগত হত্যাকাণ্ড’। বিস্ময়করভাবে, এই দানবীয় লুণ্ঠনের সামনে স্থানীয় প্রশাসনকে মনে হচ্ছে নিধিরাম সর্দার বা স্রেফ নখদন্তহীন বাঘ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তার হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নেওয়ার মতো করে সিক্স সিলিন্ডার বোমা মেশিন ও শক্তিশালী শ্যালো মেশিন দিয়ে হাড়গোড় বের করে নিচ্ছে দস্যুরা। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হচ্ছে এবং বাস্তুসংস্থান মুখ থুবড়ে পড়ছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নদী রক্ষা বাঁধ এখন বালির প্রাসাদের মতো নড়বড়ে। বর্ষার ঢল আসার আগেই নদী ভাঙনের যে নীল নকশা তৈরি হচ্ছে, তাতে নিশ্চিহ্ন হতে পারে হাজারো মানুষের ভিটেমাটি ও ফসলি জমি। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু অর্থলোভী পকেট ভারী করছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিনিময়ে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র। রাজনৈতিক তকমা গায়ে লাগিয়ে এই সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে, দিনের আলোতেই শত শত ট্রলিতে করে লুটে নিচ্ছে জাতীয় সম্পদ। সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার সাহস নেই; কারণ প্রতিবাদ করলেই জুটছে হুমকি আর লাঞ্ছনা। এই দস্যুদের দাপট এতটাই আকাশচুম্বী যে, রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি)-এর সদস্যরা টহল দিতে গিয়ে সিন্ডিকেটের নিয়োজিত ‘মহিলা বাহিনী’র হাতে চরমভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন। এমনকি তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরাও দফায় দফায় হামলার শিকার হয়েছেন। বর্তমানে এই চরাঞ্চল যেন রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র, যেখানে আইনের শাসন নয় বরং দস্যুদের তলোয়ারই শেষ কথা।
সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো প্রশাসনের কথিত ‘অভিযান’। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের গাড়ি আসার আগেই সিন্ডিকেটের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়—যা কি না ভেতরের গভীর যোগসাজশেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত। মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযানে যে জরিমানা করা হয়, তা এই সিন্ডিকেটের ‘মহাসাগরীয়’ মুনাফার কাছে স্রেফ ‘শিশিরবিন্দুর’ মতো। প্রতিদিন যেখানে মেশিন প্রতি লক্ষাধিক টাকা মুনাফা আসছে, সেখানে নামমাত্র জরিমানা আসলে অপরাধকে দমন নয় বরং বৈধতা দেওয়ার নামান্তর।
উপজেলা প্রশাসন জনবল সংকট আর দুর্গম পথের দোহাই দিয়ে দায় এড়াতে চাইলেও জনমনে প্রশ্ন—প্রকাশ্যে শত শত ট্রলি যখন পাথর পাচার করে, তখন সেই চোখ রাঙানি কি প্রশাসনের নজরে পড়ে না? দুর্গম চরাঞ্চল যদি অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়, তবে সেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আজ প্রশ্নবিদ্ধ। গ্রামবাসীর সোজাসাপটা অভিযোগ—"প্রশাসন আর সিন্ডিকেট যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।"
পরিবেশবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এই লুণ্ঠন বন্ধ না হলে তিস্তা অববাহিকা এক অপূরণীয় মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে এবং জমি হারাচ্ছে তার শাশ্বত উর্বরতা। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আইওয়াশ মার্কা অভিযান বন্ধ করে পাথর সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত উত্তোলনকারী এবং ব্যবসায়ীদের সকল মালামাল জব্দসহ কঠোর কারাদণ্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।
তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনরেখা। এই জীবনরেখাকে যারা গলা টিপে মারছে, তারা দেশ ও জাতির প্রকাশ্য শত্রু। এখন সময় এসেছে এই বিষবৃক্ষকে সমূলে উৎপাটন করার। প্রশাসন কি পারবে জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটাতে, নাকি পাথর খেকোদের এই মহোৎসব চলতেই থাকবে? এ প্রশ্ন এখন উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে।
আপনার জন্য আমি আর কি করতে পারি?
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন