প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে কঠোর অবস্থান, সামাজিক মাধ্যমে কালীগঞ্জ ইউএনওকে ঘিরে চাপ
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আক্তার জাহান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার ও দলগত চাপের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করছে, যা এক ধরনের রাজনৈতিক নীরব বুলিং ও মব বুলিংয়ের রূপ নিয়েছে।
জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) কালীগঞ্জ উপজেলা ক্যাম্পাসের পাশে রয়েল ফুটবল একাডেমি নামক একটি ক্লাবের আয়োজনে “চড়ুইভাতি” অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুমতি অনুযায়ী অনুষ্ঠানটি রাত ১০টা বা ১১টার মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা রাত ১টা পর্যন্ত চলতে থাকে। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করায় ইউএনও শামীমা আক্তার জাহান ক্লাবটির সহ-সভাপতি মিঠুকে ফোন করে অনুষ্ঠান বন্ধ না হওয়ার কারণ জানতে চান। আয়োজকেরা কিছুক্ষণের মধ্যে অনুষ্ঠান বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন বলে জানা গেছে।
ওই ফোনালাপটি আয়োজক মিঠু নিজেই রেকর্ড করেন এবং পরদিন ১৬ জানুয়ারি তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এরপর আংশিক অডিও ও ভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইউএনওকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। মিঠুর দাবি ছিল, ফোনে ইউএনওকে “আপু” বলে সম্বোধন করায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফোনালাপ এবং প্রতিবেদকের কাছে সরবরাহকৃত অডিও বিশ্লেষণে এ দাবির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অডিওতে শোনা যায়, ইউএনও মূলত অনুমোদিত সময়ের বাইরে অনুষ্ঠান চলার বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে মিঠু একাধিকবার “আপু” বলে সম্বোধন করলে ইউএনও বলেন, “কাইন্ড ইউওর ইনফরমেশন, আমি আপনার আপু না,” এরপর তিনি কলটি শেষ করেন।
এ বিষয়ে ইউএনও শামীমা আক্তার জাহান বলেন, বিষয়টি পুরোপুরি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি জানান, আয়োজকেরা অনুষ্ঠানের অনুমতি ও দাওয়াত দিতে এসেছিলেন, তবে নির্বাচনকালীন সময়ে তিনি দাওয়াত গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং অনুষ্ঠান না করতেও পরামর্শ দেন। পরে আয়োজকেরা সময় চেয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত অনুমতি নেন। তিনি বলেন, রাত ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চালানোর কারণ জানতে চাওয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য, যা অডিও শুনলেই স্পষ্ট হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ইউএনওর বিরুদ্ধে চলমান অপপ্রচারের পেছনে মূলত তিনটি ঘটনা কাজ করেছে। প্রথমত, ১৫ জানুয়ারি কালীগঞ্জে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি নিয়োগ পরীক্ষা চলাকালে ইউএনওর অনুমতি ছাড়া এক ব্যক্তি পরীক্ষা হলে প্রবেশ করলে নিয়ম অনুযায়ী তাকে হল ত্যাগ করতে বলা হয়। দ্বিতীয়ত, কালীগঞ্জের একটি হোটেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড মহোদয় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় একটি পক্ষ ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করে জরিমানা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে অনুরোধ জানায়, যা তিনি আইনানুগ দায়িত্ব পালনের স্বার্থে প্রত্যাখ্যান করেন। তৃতীয়ত, একই দিন রাতে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের অনুমতি ছিল রাত ১১টা পর্যন্ত, কিন্তু তা রাত ১টা পর্যন্ত চলতে থাকায় এবং দেশ নির্বাচনমুখী অবস্থায় থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইউএনও টুর্নামেন্টটি বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
এদিকে মিঠু বলেন, অনুমতি নেওয়ার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং রাত ১১টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার কথা বলা হয়েছিল। তবে এক আনন্দের সঙ্গে আরেক আনন্দ যুক্ত হওয়ায় কিছুটা দেরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন এবং নির্বাচনকালীন বিধিনিষেধ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
রায়হান শরিফ নামের একজন দর্শনের শিক্ষক বলেন, একজন সাধারণ মানুষের সরকারি কর্মকর্তার ফোনকল রেকর্ড করা এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া প্রশ্নবিদ্ধ ও উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ইউএনও একই সঙ্গে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হওয়ায় নির্বাচনকালীন সময়ে এ ধরনের আংশিক অডিও ছড়িয়ে দেওয়া প্রশাসনিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের কারণে নেওয়া সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আংশিক তথ্য ও বিকৃত উপস্থাপনার মাধ্যমে যে সামাজিক চাপ ও দলগত আক্রমণ তৈরি করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে মব বুলিং ও রাজনৈতিক নীরব বুলিংয়ের লক্ষণ। তারা মনে করেন, পূর্ণ তথ্য যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাউকে লক্ষ্য করে এ ধরনের আক্রমণ ব্যক্তি ও প্রশাসন উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর এবং এ প্রবণতা থেকে সবাইকে বিরত থাকা উচিত।
সাম্প্রতিক মন্তব্য
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য লিখুন