রংপুর নিউজ ডেস্কঃ
দূর থেকে দেখে মনে হলো, যেন ত্রাণের জন্য দীর্ঘ লাইন। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ভুল ভাঙল। ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য কিনছেন মাদকসেবীরা। গত বুধবার রাত ১১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্প এলাকায় গিয়ে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির এই দৃশ্য চোখে পড়ে।
লাইন ধরে মাদক কিনছেন মাদকসেবীরাসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না মাদক ব্যবসা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজধানীতে সহস্রাধিক মাদক স্পট চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযান চলছে। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায়—এমনকি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক ব্যবসা।
অভিযোগ রয়েছে, মাদকের টাকা জোগাড়ে কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীরা ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ডিএনসি বলছে, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পসহ রাজধানীর ছয়টি এলাকায় মাদক ব্যবসা বেশি। অন্য এলাকাগুলো হচ্ছে মহাখালীর কড়াইল বস্তি, পল্লবীর কালশী বিহারি ক্যাম্প, কারওয়ান বাজার রেলগেট বস্তি, খিলগাঁও-বাসাবোর ওহাব কলোনি ও যাত্রাবাড়ী। তরুণরা ইয়াবা, হেরোইন ও ক্রিস্টাল মেথ ( আইস) সেবন করছে বেশি।
বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা হয়ে দেশে মাদক ঢুকছে জানিয়ে ডিএনসি ও পুলিশ বলছে, মাদক পাচারকারীরা বারবার রুট পরিবর্তন করছে।
সীমান্ত এলাকায় বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে। এখন ট্রেনেও তারা মাদক পাচার করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাদকদ্রব্য পাচারের অন্যতম রুট কক্সবাজার এবং মায়ানমারের সীমান্তঘেঁষা টেকনাফ। হেরোইন ও কোকেন দেশে এনে অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করছে তারা।
পুলিশ ও র্যাবের তথ্য মতে, বেনাপোলের পুটখালী, শিকারপুর, রঘুনাথপুর, অভ্রভুলাট ও দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত মাদক ঢুকছে দেশে।
আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ী চক্রের অর্ধশতাধিক সদস্য এতে জড়িত।
সর্বশেষ গত শুক্রবার দিবাগত রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে এক লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ডিএনসি, যার বর্তমান বাজারমূল্য কোটি টাকা জানিয়ে ডিএনসির ঢাকা মহানগর উত্তর কার্যালয়ের উপপরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, টেকনাফ থেকে বিলাসবহুল গাড়িতে সংঘবদ্ধ একটি বড় মাদক ব্যবসায়ী চক্র এই বিপুল ইয়াবা এনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করত। এরা বায়িং হাউস ও আবাসান ব্যবসার মতো বিভিন্ন পেশার আড়ালে মাদক ব্যবসা করছে।
শামীম আহমেদ জানান, হাতিরঝিলে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন নজরুল ইসলাম ওরফে সোহেল রানা, আল-মামুন, মোহাম্মদ ফারুক ওরফে ওমর ফারুক ও ফারুকের স্ত্রী তানিয়া।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাতে ডিএনসি জানায়, আসন্ন ঈদ সামনে রেখে তারা বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাচারের উদ্যোগ নিয়েছে। মাদক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে টেকনাফের একটি রিসোর্ট তারা ব্যবহার করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলা হয়েছে আট হাজার ১৮টি। জানুয়ারি মাসে চার হাজার ৩৮৬ এবং ফেব্রুয়ারিতে তিন হাজার ৬৩২টি মামলা হয়। এর মধ্যে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে এক হাজার ৫৭টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি ইনামুল হক সাগর কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রেপ্তার মোট আসামির মধ্যে মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলার আসামি বেশি।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ইয়াবার পর কোকেন ও হেরোইন এখন দেশের তরুণ ও যুব সমাজের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্প : সরেজমিনে মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাম্পের ৭ নম্বর ব্লকের সামনেই লম্বা লাইন ধরে মাদক কিনতে দাঁড়িয়ে আছে ১৫-২০ জন। পাশের ১, ২ ও ৩ নম্বর ব্লকে গিয়ে দেখা যায়, পুরোটা জুড়ে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি হচ্ছে। এ সময় শীর্ষ মাদক বিক্রেতা সাল্লু ও ইসতিয়াকের নিয়ন্ত্রণে অন্তত ২৫ জন খুচরা মাদক বিক্রেতা এই এলাকায় ঘুরে ঘুরে মাদক বিক্রি করছিল। তারা বিভিন্ন সাংকেতিক ভাষায় গ্রাহক ডাকছিল।
নাম প্রকাশ না করে এ নিয়ে ক্যাম্পের এক মাদক ব্যবসায়ী বলেন, মাদকসেবীরা সাংকেতিক শব্দ শুনলেই বুঝতে পারে, কার কাছে কী আছে। ক্রেতাদের বেশির ভাগই নিয়মিত জানিয়ে ওই ব্যক্তি দাবি করেন, তাঁরা প্রাশাসনকে ম্যানেজ করেই ক্যাম্পে মাদক বিক্রি করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্তমানে মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পের ১৫টি চক্রের শতাধিক শীর্ষ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছে আরজু, হৃদয় শাহ, বাচা, টুনটুন, পাঁচু, জামশেদ বুনডিয়া, জোসিম, আরমান, মুন্না, রাশেদ ওরফে মুকতার ও তার ভাই হামজা, পিচ্চি রাজা, তার শ্বশুর খুরশিদ, আদিল, বড় রাজা ও তার ভাই শাহজাদা। এই চক্রের অন্যতম সদস্য দিলদার চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবা এনে ক্যাম্পে বিক্রি করেন। আরেক বড় মাদক ব্যবসায়ী ‘চুয়া সেলিম’ বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তাঁর পরিবারের সদস্যরা মাদক বিক্রি করছে। এর বাইরে নতুন একটি চক্রে রয়েছেন সামির ওরফে নেটা সামির ও তাঁর মামা কামরান। তাঁরা দিলদার নামের এক পাইকারি সরবরাহকারীর কাছ থেকে মাদক এনে বিক্রি করেন। কারাগারে থাকা পারভেজের সহযোগী আলমগীর এখন নতুন করে ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা শুরু করেছেন।
আকবর নামে ক্যাম্পের এক বাসিন্দা বলেন, মাদক বিক্রির সময় ক্যাম্পের চারপাশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর টহল থাকে। অজানা কারণে মাদক বিক্রির সময় তাদের গ্রেপ্তার করে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অনেক সোর্সও মাদক ব্যবসায় জড়িত।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসান বলেন, শুধু নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল করা কঠিন। সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে এতে সুফল পাওয়া যেতে পারে।
ডিএনসির পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) তানভীর মমতাজ বলেন, ইয়াবার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে কোকেন-হেরোইনের চালান দেশে ঢুকছে। তবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
মাদকসেবীরা যা বলছেন : রাজধানীতে একাধিক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন হেরোইন ও কোকেনে আসক্ত অন্তত ২১ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা পারিবারিক নানা অশান্তির পাশাপাশি বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে, মাদক ব্যবসায়ীদের দ্বারা আসক্ত হয়ে পড়েন। এর মধ্যে অনেক তরুণীও রয়েছেন।
জানতে চাইলে ‘মানস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. অরূপ রতন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, তরুণসমাজকে শিক্ষায় মনোযোগী করতে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যথারীতি মাদক নির্মূলে গতানুগতিক কাজ পরিচালিত হলেও একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না। ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা বা মাফিয়া চক্র এখন সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে।