মোঃ বুলবুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ
কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলায় অটোরিকশা আটকে দম্পতিকে হয়রানির অভিযোগে হওয়া মামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেৃতত্বদানকারী এক ছাত্র প্রতিনিধিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে কুড়িগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহারের দাবিতে বিবৃতি দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রাম জেলা শাখা।
মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) রাতে সংগঠনের জেলা শাখার যুগ্ম দপ্তর সচিব ও দপ্তর সেলের সেল সম্পাদক লোকমান হোসেন স্বাক্ষরিত প্রতিবাদ বিবৃতিতে কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপার (এসপি) মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট আচরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রাম জেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ নাহিদ বিবৃতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এসপির ‘ ফ্যাসিস্ট আচরণের’ প্রতিবাদ জানিয়ে তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন এই ছাত্রনেতা।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেৃতত্বদানকারী রাজিবপুর উপজেলা ছাত্রপ্রতিনিধি মেহেদী হাসানসহ চার জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ী। মেহেদী ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে ওই ব্যবসায়ীর মেয়ে ও জামাইসহ কয়েকজনকে অপহরণ ও শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। পরে ছাত্রপ্রতিনিধি মেহেদীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
রাজিবপুরের বাসিন্দা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সংগঠক রবিউল ইসলাম রবিন এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘ঈদের রাতে অটোরিকশায় কয়েকজন যুবক ও দুজন মেয়ে যাচ্ছিল। বিষয়টিতে সন্দেহ হওয়ায় অটোরিকশা থামিয়ে যাত্রীদের পরিচয় ও গন্তব্য জানতে চেয়েছিলেন ছাত্রপ্রতিনিধি। শুধুমাত্র মেয়েদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এমনটা করেছিল। সেখানে বিবাহিত দম্পতি থাকার বিষয়টি জানা ছিল না। কিন্তু এ ঘটনায় ছাত্রপ্রতিনিধির সাথে অটোরিকশায় থাকা জেলা শিক্ষা অফিসার (ডিই্ও) শামসুল আলমের ছেলে শিহাবের বাগবিতন্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। বিষয়টিকে প্রভাব খাটিয়ে মামলা ও গ্রেফতারে পর্যায়ে নিয়ে গেছেন এসপি ও ডিইও।
লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রপ্রতিনিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে মামলা দায়ের এবং গ্রেফতারের পিছনে এসপি মাহফুজুর রহমানের ফ্যাসিস্ট আচরণ দায়ী।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, মিথ্য অভিযোগে মামলা দায়ের করে ছাত্র প্রতিনিধির চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। মাত্র ২৮ মিনিটের ব্যবধানে মামলা নথিভুক্ত করে ছাত্রপ্রতিনিধিকে গ্রেফতার করে দ্রুততার সাথে চালান দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ন্যুনতম তদন্ত করেনি পুলিশ। মূলত পুলিশ সুপারের ‘অতি আগ্রহে’ পুলিশ তড়িৎকর্মা হয়ে পড়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিপ্লবের পক্ষের শক্তিকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এসপি কোন অপশক্তির ইশারায় এমন ফ্যাসিস্ট আচরণ করছেন তা নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’
এসপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ‘ জুলাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কোনও ধরণের তদন্ত ছাড়াই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অথচ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র জান্নাতুল তহুরা তন্নীর ওপর হামলা করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো এসপি মাহফুজুর রহমান হামলাকারীদের সাথে আপসের পরামর্শ দেন।’
পুলিশের আচরণকে ফ্যাসিস্ট উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়েছে,‘ জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় পুিলশ প্রশাসন আমাদের বিরুেদ্ধ যে দমনমূলক আচরণ করেছিল, তা আমরা ভুলিনি। কিন্তু পুলিশ তাদের পুরেনা ফ্যাসিস্ট প্রবণতা ত্যাগ করেনি। তারা কেবলমাত্র স্বৈরাচারী হাসিনার পরিবর্তে নতুন মদদদাতার ছায়ায় পুরনো দমননীতিই বজায় রেখেছে।’
পুলিশ প্রশাসনের প্রতি হঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই যে, বিপ্লবের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্রকে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। জনগণের স্বার্থ রক্ষার লড়াই অব্যাহত থাকবে এবং প্রশাসনের ফ্যাসিস্ট আচরণের বিরুেদ্ধ যথাযথ পদক্ষেপ নিতে আমরা বদ্ধপরিকর।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রাম জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক রাজ্য জ্যোতি বলেন, ‘এসপি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এর মধ্যে গোপনে দ্রুততার সাথে মামলা নথিভুক্ত করে ছাত্রপ্রতিনিধিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। এটা এক ধরণের প্রতারণা। সাধারণ মানুষ মামলা করতে গেলে পুলিশের হয়রানির শিকার হন। অথচ শিক্ষা অফিসারের পরিবারের সদস্য হওয়ায় সত্যতা যাচাই ছাড়াই তড়িৎ গতিতে পুলিশ তৎপর হয়ে গেলো। এটা জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষার পরিপন্থি।’
সংগঠনটির আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ নাহিদ বলেন, ‘ আমাদের ফোরামে আলোচনা করে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। সামান্য ঘটনায় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে মামলা ও গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা এজন্য এসপিকে দায়ী করছি। তিনি জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্টের আচরণ অব্যাহত রেখেছেন। অনতিবিলম্বে তার প্রত্যাহার দাবি করছি।’
সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে এসপি মাহফুজুর রহমানকে ফোন দিলে তার ফোন এঙ্গেজ পাওয়া গেছে। কয়েকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে ম্যাসেজ দিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলেও তিনি কোনও উত্তর দেননি।